Thursday, February 12, 2026
Homeমতামতলন্ডন বৈঠক ও নির্বাচনী সমঝোতা: সম্ভাবনার পথে বাংলাদেশ

লন্ডন বৈঠক ও নির্বাচনী সমঝোতা: সম্ভাবনার পথে বাংলাদেশ

আহমেদ স্বপন মাহমুদ
চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লন্ডন বৈঠক একটি সম্ভাবনাময় উত্তরণের দ্বার উন্মোচন করেছে। প্রায় দেড় ঘণ্টার দীর্ঘ একান্ত আলাপ, পরবর্তী যৌথ বিবৃতি ও সংবাদ সম্মেলনের হাস্যোজ্জ্বল দেহভঙ্গি সব কিছুতেই ফুটে উঠেছে পরস্পরের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ও সমঝোতার ভাষা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে যে সম্ভাব্য অভিন্ন সময়রেখা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তবে এ ধরনের বৈঠক ঘিরে নানা কৌতূহলও সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব বিষয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা হয়নি যেমন বন্দর, করিডোর, কূটনৈতিক ভারসাম্যসহ জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় ইত্যাদি নিয়ে জনগণ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের মাঝে প্রশ্ন রয়েছে। একটি স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রত্যাশা থেকে এসব প্রশ্নকে অস্বাভাবিক বলা যাবে না।
জামাত ও এনসিপির প্রতিক্রিয়া এসব কৌতূহলের পাশাপাশি ভিন্নমতের মাত্রা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। তারা প্রশ্ন তুলেছে, দেশের বাইরে একটি দলের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচন নির্ধারণ কি গ্রহণযোগ্য? এনসিপি সরাসরি বলেছে, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে এটা বিচ্যুতি। তাদের বক্তব্যে ‘জুলাই সনদ’ ও ‘ঘোষণাপত্র’-এর প্রতি অনুগত্য পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। বিএনপি ও অন্যান্য দলগুলোও জুলাই সনদ ও ঘোষনা পত্রের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে।
তবে জামাত-এনসিপির প্রতিক্রিয়ার বিপরীতে দেশের বৃহৎ অংশের রাজনৈতিক মহল ও জনগণ এই সমঝোতাকে ইতিবাচক বলেই দেখছেন।তারা মনে করেন, এতে অন্তত নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের ঝুঁকি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। বিএনপি ও সরকারের মধ্যে যে দূরত্ব ছিল, তা কিছুটা হলেও কমেছে এবং একটি রাজনৈতিক ও নির্বাচনকেন্দ্রিক রূপরেখা তৈরির সম্ভাবনা বেড়েছে। যদিও এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।
নির্বাচনের পূর্বশর্ত হিসেবে অধ্যাপক ইউনূস বারবার যে বিষয়গুলো তুলে ধরছেন সেগুলো হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বিচারিক প্রক্রিয়ার গতি বৃদ্ধি, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ইত্যাদি এখনো অনেকটাই অপরিপূর্ণ। একটি অবাধ সুষ্টু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে হলে এসব ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। নির্বাচন সংক্রান্ত সংস্কারসহ আরও কিছু জরুরি সংস্কার ও বিচারকে ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। আবার বিশেষ করে জামাত ও এনসিপি যে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর দাবি জানিয়েছে, তা বিগত সময়ে রাজনৈতিক ব্যবহারে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বর্তমানে তা আরও স্পষ্ট সংজ্ঞার দাবি রাখে।
বর্তমান সরকার যেহেতু একটি অন্তর্বর্তীকালীন ‘নিরপেক্ষ’ সরকার, সে কারণে তাদের সব কর্মকাণ্ডকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং পক্ষপাতশূন্য হতে হবে। প্রধান উপদেষ্টার এনসিপি-ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ, কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে গতি না থাকার বিষয়টি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ১০ মাসে বিচার ব্যবস্থায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়াও প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। সরকারের উচিৎ রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কার প্রশ্নে যে বিষয়গুলোতে ঐক্যমত্য হয়েছে সেগুলো গুরুত্ব দিয়ে সম্পন্ন করা।
আগামী নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে জনগণের প্রত্যাশা ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতি বেড়েই চলেছে। বিশেষত বিএনপির ওপর দায়িত্ব আরও বেশি, কারণ লন্ডন বৈঠকের পর তারা আবারও জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে। এখন তাদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা শুধু ক্ষমতার রাজনীতির অংশীদার নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে সক্ষম, যেখানে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। একটি বিকল্প বৈষম্যহীন অংশগ্রহণমূলক শাসন কাঠামোর গণতান্ত্রিক রূপরেখা নির্মাণে তৎপর হতে হবে দলটিকে। অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি আগামী দিনে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠন করবে এটিই জনগণ দেখতে চায়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, তারুণ্যের শক্তি এবং স্পর্ধা ছিল পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। জুলাই অভ্যুত্থান, লাখ লাখ তরুণের অংশগ্রহণ, সহস্রাধিক জীবনদানের ঘটনা একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পালাবদলের সূচনা করেছে। সেসব আত্মত্যাগের প্রেক্ষাপটে রাজনীতি যদি আবার কূটকৌশলের শিকার হয়, তবে জনআস্থা ফিরে আসবে না। দোষত্রুটি সত্ত্বেও তরুণদের বলিষ্ঠ অংশগ্রহণ রাজনীতিকে দায়বদ্ধ রাখবে, এটাই সকলে প্রত্যাশা করে।
নতুন দল এনসিপির প্রসঙ্গে জনমনে দ্বৈত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। একদিকে তারা বিকল্প রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা বলছে, অন্যদিকে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন এবং জামাতঘেঁষা অবস্থান নিয়ে অভিযোগ ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এসব প্রশ্ন অস্বাভাবিক নয়, বরং রাজনৈতিক পরিশুদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয়। তবে জামাত-এনসিপি সম্পর্ক আগামী দিনে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথেই বাধা হয়েও দাঁড়াতে পারে যদি না জামাত মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা না চায়। এবং এনসিপি তাদের অবস্থান জনগণের সামনে পরিস্কার না করে।
তাছাড়া বিএনপিকেও নিজের অবস্থান পরিস্কার করতে হবে। তারা কিভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবাধিকার, বিচারব্যবস্থা এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করবে তা জনগণকে জানাতে হবে। শুধু মাত্র নির্বাচন চাওয়া নয়, নির্বাচনের পর একটি সুশাসনের কাঠামো জনগণের সামনে হাজির করাও দলটির রাজনৈতিক দায়িত্ব। কারণ বিএনপি যদি শাসন ক্ষমতায় আসে তাহলে তাদের ওপর জনপ্রত্যাশার চাপ বাড়বে। বিএনপি নেতৃবৃন্দকে জনগণের চাওয়া পাওয়ার মূল্য দিতে হবে। বিএনপিকে আরও একটি বিষয়ে জনগণের কাছে স্পষ্ট করে তুধে ধরতে হবে তা হচ্ছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও আধিপত্যবাদের প্রশ্নে তাদের সুষ্পষ্ট অবস্থান। কারণ ভারতই ফ্যাসিস্ট সরকারকে সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রাখছে গত পনের বছর। ভারতের আধিপত্যের প্রশ্নে দেশবাসী সজাগ এবং আর কোনো ছাড় দিতে চায় না। দুদেশের সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদার এটি জনগণের চাওয়া। পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থতানের স্পিরিটকে ধারণ করে পুরোনো রীতিনীতি বাদ দিয়ে বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে সক্রিয় রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা ও কর্মসূচি ব্যক্ত করতে হবে।
অন্যদিকে, সরকারকে অবশ্যই অবশিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আরও নিরপেক্ষ ও কার্যকর করার উদ্যোগ নিতে হবে। একটি সুষ্টু নির্বাচন আয়োজনের জন্য সকল প্রকার আয়োজন সম্পন্ন করতে হবে। জনগণ এখন আর মুখের কথা শুনে সন্তুষ্ট হয় না, তারা কাজের প্রমাণ দেখতে চায়। নির্বাচন কমিশনও সক্রিয় হবে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সকল প্রস্কুতি সম্পন্ন করতে।
শেষ পর্যন্ত স্মরণে রাখতে হবে, এই রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দাবিতে যে তরুণ প্রজন্ম রাজপথে জীবন দিয়েছে, তাদের চেতনাকে সম্মান জানানো প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নৈতিক কর্তব্য। যদি সেই চেতনা বিস্মৃত হয়, যদি ক্ষমতার পালাবদলই একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়, তবে তরুণ সমাজই আবার রাজপথে নামবে, আর স্লোগান তুলবে—“বুকের মধ্যে দারুণ ঝড়, বুকে পেতেছি গুলি কর।”
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে যে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সুযোগ এসেছে, তা জনআকাঙ্ক্ষার সাপেক্ষে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে শুধু একটি নির্বাচনই নয়, একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা ঘটতে পারে।

আহমেদ স্বপন মাহমুদ: কবি ও মানবাধিকার কর্মী।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments